টপ ৫: আহমদ ছফার লেখা সেরা ৫ টি বই

অনেকের মতে কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক হচ্ছেন আহমদ ছফা। বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয়, সামাজিকতা, রাজনৈতিকতা তার সাহিত্যে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। এছাড়াও আহমদ ছফা রচিত প্রতিটি উপন্যাসই ভাষিক সৌকর্য, বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অভিনবত্বে অনন্য। মানসিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুষঙ্গসহ ছফার চরিত্র সৃষ্টির তথা কাহিনীকথনের পারঙ্গমতা অসামান্য। এই পর্বে লেখক আহমদ ছফার লেখা সেরা ৫ টি বই নিয়ে আলোচনা করা হলো।

আহমদ ছফার লেখা সেরা ৫ টি বই

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী প্রচ্ছদ

অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী প্রচ্ছদ

তিনটি ভিন্নরূপে তিন নারীমূর্তি বেশ সাবলীলভাবে লেখক আহমদ ছফা “অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী” উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথমজন ‘দুরদানা’ যে তারা নারীত্ব নিয়ে নিয়ে মাথা ঘামায় না, এরপর ‘শামারোখ’ যে তার নারীত্ব দিয়ে দুনিয়া বশে আনতে চায়, যে শামারোখের কথা সবার মুখে মুখে ঘুরত সেই শামারোখের হারিয়ে যাওয়া, পরিণতি আসলেই মনে রাখার মত। ‘সোহিনী’ যাকে উদ্দেশ্য করে বইটা লেখা কিন্তু তেমন কিছু তার সম্পর্কে বলা হয় নি। আপাদমস্তক বিভ্রান্ত প্রেম কাহিনী মনে হলেও “অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী” মূলত কিছু রুপক নামের আড়ালে লেখা আত্নজীবনী। সাথে যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকার এক স্পষ্ট দৃশ্য বই টি তে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের রোমাঞ্চ, বাঁক, অনুভূতি গুলো পাঠকে কল্পনার দোলনায় ভ্রমন করাতে বাধ্য করবে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেরা ৫ টি বই

ওঙ্কার

ওঙ্কার প্রচ্ছদ

ওঙ্কার প্রচ্ছদ

আদমদ ছফার লেখা “ওঙ্কার” ৬৯ এ আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত একটি উপন্যাস। স্বাধীনতার দাবি যখন আঘাত করেছিল পূর্ব বাঙলার আনাচে কানাচে, ঠিক তখন সে ধাক্কা লাগে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। বাঙ্গালি একটু স্বাধীন জমির জন্য কীভাবে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল, মিছিলে মিছিলে কীভাবে বাংলার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল তারই দলিল ওঙ্কার। আহমদ ছফা এই বইতে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কোনো নাম দেননি। উপন্যাসে দেখা যায় নিরুপায় হয়ে কথক এক বোবা মেয়েকে বিয়ে করেন। বোবা বউকে নিয়ে গল্পকথক তেমন সুখ অনুভব করত না। যতদিন যেতে থাকে, ততই তাকে ঘিরে ধরে অদ্ভুত এক ক্ষুধা। অন্যদিকে দেশজুড়ে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়। শেখ মুজিব গ্রেফতার হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলায়। গল্পকথকের শশুড় ছিল পাকিস্তান সরকারের আমলা। গল্পকথকের এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নাই। শ্বশুর যা দিয়েছেন তা দিয়েই তিনি খুশি। বিপ্লব, মিছিল, শ্লোগান এসব তাঁকে কাঁপায় না তেমন করে। সে বলে, “আগেইতো বলেছি, ইচ্ছেশক্তি বলতে কোনোকিছুই নেই। তাই বলে আমি যে কিছু চাইনে একথা সত্যি নয়। নানা জায়গায় আমার যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু চরন সামনে চলতে রাজি হয় না… এমন নিষ্ক্রিয় পুরুষ আমি।” একপর্যায়ে মিছিলের উত্তাল আঘাত করে তার বউকে। সারাজীবন যে বউ তাকে দিয়ে গিয়েছে শুধুই না পাওয়ার যন্ত্রনা, তার মাঝেই সে নতুন করে খুঁজে পেতে থাকে অন্য এক মানবিকে।

গাভী বিত্তান্ত

গাভী বিত্তান্ত প্রচ্ছদ

গাভী বিত্তান্ত প্রচ্ছদ

বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য উপাচার্য্য পদে নিযুক্ত আবু জুনায়েদের জীবন কাহিনী নিয়ে মূলত এই “গাভী বিত্তান্ত” বইটি লিখা হয়েছে। গোবেচারা টাইপ একটা মানুষ কিভাবে সকল ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠে এবং তাকে ঘিরে থাকা মানুষদের কার্যক্রম বইটিতে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। বৃহৎ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে জুনায়েদ সাহেব নানাবিধ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। এর কোনটা ছিল পরম আনন্দের, আবার কোনটা ছিল বিষাদের। ছোট বয়স থেকে তার একটা গাভী লালনপালনের যে ইচ্ছে ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজাদার এবং মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদের স্ত্রীর পূর্বপরিচিত তবারক আলী পূরণ করে দেওয়ার পরে এই উপন্যাসে নতুন মাত্রা যোগ পায়। এদিকে জুনায়েদ সাহেবের স্ত্রী গাভীটাকে মনে করতে থাকেন তার ‘সতীন’ বা ‘শত্রু’ । তিনি ষড়যন্ত্র করতে থাকেন, কিভাবে গাভীটাকে হত্যা করা যায়। অবশেষে বিষ খাইয়ে যখন গাভীটাকে হত্যা করা হলো, জুনায়েদ সাহেব বাকরোধ হয়ে পরেন। কিন্তু একই সময়ে উনি আমেরিকায় বক্তৃতা দেয়ার জন্যে দারুণ একটা অফার পান এবং স্ত্রীকে তা বলতে গেলে তার স্ত্রী সরল স্বীকারোত্তিতে বলে দেয়, সেইই খুন করে গাভীটাকে। এরপর উপন্যাসের শেষটা অনেকটা অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে লেখক শেষ করেন। লেখক উপন্যাসটি দ্বারা কি বুঝাতে চেয়েছে তা সত্যই রহস্য রয়ে গেছে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সেরা ৫ বই

যদ্যপি আমার গুরু

যদ্যপি আমার গুরু প্রচ্ছদ

যদ্যপি আমার গুরু প্রচ্ছদ

যদ্যপি আমার গুরু” লেখক আহমদ ছফার লেখা জীবনীমূলক গ্রন্থ। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের অনেক কথাই তুলে ধরেছেন বইটিতে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, বলতে গেলে, চারটি দশক ধরেই তরুন বিদ্যার্থীদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একজন প্রবাদতুল্য পুরুষ। কিন্তু তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিধি কতদূর বিস্তৃত, আর তিনি ব্যক্তি মানুষটি কেমন সে বিষয়েও মুষ্টিমেয় ক’জনের বাইরে খুব বেশি মানুষের সম্যক ধারণা নেই। যদ্যপি আমার গুরু বইটি পাঠক-সাধারণের মনে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মনীষা এবং মানুষ আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে একটি ধারণা গঠন করতে অনেকখানি সাহায্য করবে।

বাঙালি মুসলমানের মন

বাঙালি মুসলমানের মন প্রচ্ছদ

বাঙালি মুসলমানের মন প্রচ্ছদ

আহমদ সফার লেখা “বাঙালি মুসলমানের মন” তার বিখ্যাত ও সবচেয়ে সমালোচিত প্রবন্ধ গ্রন্থ। প্রবন্ধ গ্রন্থের নাম “বাঙালি মুসলমানের মন” হলেও বইটিতে ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে মোট ১২ টি প্রবন্ধ রয়েছে। বৌদ্ধধর্ম যুগের রাজত্ব অবসানের পরে মুসলিম বিজয়ের সময়ে এদেশের বড় সংখ্যার একটি বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের অন্ত্যজ (ডোম, হড্ডি, হরিজন ইত্যাদি) জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। শত বছরের ইতিহাসে রক্তে এসেছে স্রোত। এক রক্ত আরেক রক্তের সাথে মিশে সৃষ্টি করেছে নতুন জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই সুপ্রাচীন সময় থেকে আজ অবধি বাঙালী মুসলমানের চিন্তাধারার মূল কাঠামোটি রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। আর সেই কথাই লেখক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন নিজস্ব যুক্তি, বিশ্লেষণ আর দর্শনের মধ্য দিয় বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধে। এছাড়াও শিক্ষার দর্শন ও সুলতানের সাধনা প্রবন্ধ দুটিতে লেখক রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রীত শিক্ষা ব্যবস্থা, ভারতবর্ষের চিত্রকলার উত্থান, ইতিহাস, ক্রম বিবর্তন ইত্যাদি তুলে ধরেছেন।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *