টপ ৫: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেরা ৫ বই

“বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারী’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!”

তিনি বিদ্রোহী কবি, তিনি প্রেমের কবি, তিনি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি কাজী নজরুল ইসলাম! যিনি কবিতা, গল্প, গান, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এক বিরল সাহিত্যের স্রষ্টা! চেতনা ও মনন বিকাশে কাজী নজরুল ইসলামের বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। “অগ্নিবীণা” থেকে “রুদ্র-মঙ্গল” বা “কবিতা” থেকে “প্রবন্ধ” সবখানেই কবির অসীম বিদ্রোহী প্রতিভার ছাপ। কবিতায় ধর্ম, বিদ্রোহের পাশাপাশি লিখেছেন তার ভালোবাসার কথা। গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসে তুলে ধরেছেন বাস্তবিকতা, ধর্ম, সমাজ, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে নজরুল সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ। এর মধ্য থেকে এই পর্বে কবির সেরা পাঁচটি বই নিয়ে আলোচনা করা হলো:

কাজী নজরুল ইসলামের সেরা ৫ বই

মৃত্যুক্ষুধা

মৃত্যুক্ষুধা

মৃত্যুক্ষুধা

‘মৃত্যুক্ষুধা’ কাজী নজরুল ইসলামের লেখা একটি অন্যতম সেরা উপন্যাস। এটি ১৯৩১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর আগে উপন্যাসটি সওদাগর পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের পটভূমি কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের এক বস্তি এলাকায় সৃষ্ট! নারী জীবনের দুর্বিসহ অন্ধকার সমাজের বাস্তব চিত্র কবি তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে। নিম্ন বর্গের মানুষের দুঃখ বেদনার চিত্র এই উপন্যাস কে দিয়েছে আসল রূপ। তৎকালিন দারিদ্র্য, ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষের পরিপ্রেক্ষিতে সপরিবার মুসলিম থেকে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করার বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখা যায় উপন্যাসটিতে। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র রূবি আনসার নামক এক ছেলেকে ভালোবাসলেও সামাজিকতা মেনে নিতে গিয়ে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ হয়। রুবির বাবা বিয়ে দিয়ে দেয় অন্য ছেলের সাথে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে রুবির স্বামী মারা গেলে তার জীবনে নেমে আসে সমাজের অন্ধ বিধি নিষেধ এবং সমাজের কঠিন বাস্তবিকতার ছায়া। এই সব প্রতিকূলতার মাঝেই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ হতে থাকে। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনন্য সৃষ্টি। বাস্তব জীবন অনুভব করিয়ে দেয় বইটি।

রিক্তের বেদন

রিক্তের বেদন

রিক্তের বেদন

কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা গল্প গ্রন্থ ‘রিক্তের বেদন’ ১৯২৪ সালে কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। ৮ টি গল্প দ্বারা সাজানো বইটিতে কবির প্রথম লেখা গল্প “বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী” অন্তভূক্ত করা হয়। বাকি গল্প গুলো যথা: ‘রিক্তের বেদন’, ‘মেহের নেগার’, ‘সাঁঝের তারা’, ‘রাক্ষুসী’, ‘সালেক’, ‘স্বামী-হারা’, ‘দুরন্ত পথিক’ ইত্যাদি গল্প সমূহে কিশোর জীবনের কিছু চিত্র তুলে ধরেছে। রিক্তের বেদন গল্পের শুরুতেই দেখা যায় এক কিশোরকে যার যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বন্ধুর জোর-চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় সে! সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, মায়ের বুক খালি করে, সকল স্নেহকে শক্তিতে পরিণত করে শেষে কিশোরটি ট্রেনে উঠে। কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠে এক কিশোরী! সেই ফেলে আসা শাহিদা! আর কি দেখা হবে? যেই শাহিদার সাথে কথা না বলে এক দিন থাকা যেত না সেই শাহিদাকে ছেড়ে আজ দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে যাচ্ছে! সে কি পারবে? জীবন দেওয়ার আগ মুহূর্তে কি তাঁর প্রিয় শাহিদার মুখ ভেসে উঠবে না? নজরুল তার নিপুন ভাষায় কিশোরটির পিছুটান তুলে ধরেছেন। যে পিছুটান গুলো এক সময় শক্তিতে রূপ নিতে দেখা যায়। এছাড়া বাকি গল্প গুলোর মধ্যে “বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী” তে বিরহ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন এবং “সালেক” গল্পে সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন ইত্যাদি।

রুদ্র-মঙ্গল

রুদ্র-মঙ্গল

রুদ্র-মঙ্গল

‘রুদ্র-মঙ্গল’ কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ গ্রন্থ। ১৯২৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হলে অন্যান্য কিছু গ্রন্থের মতো বিতর্কের জন্ম দেয়।সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রিটিশ বিরুধী প্রবন্ধ গুলো আজও লোমকে শিহরিত করে। গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধ গুলো যথা: “রুদ্র-মঙ্গল”, “আমার পথ”, “মোহর্‌রম”, “বিষ-বাণী”, “ক্ষুদিরামের মা”, “ধূমকেতু’র পথ”, “মন্দির ও মসজিদ”, “হিন্দু-মুসলমান” ইত্যাদি। নিচে “রুদ্র-মঙ্গল” প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো:

রুদ্র-মঙ্গল: নজরুল “রুদ্র-মঙ্গল” প্রবন্ধে তুলে ধরছেন রক্ত মাংসে গড়া এক অত্যাচারী মানবের রূপ। নিজ চক্ষে মায়ের অপমান দেখেও চুপ থাকা সেই শ্রেণীর মানুষদের এই প্রবন্ধে পৌরষত্বের হুংকার দিয়ে অত্মাচারীর বুকে যাপিয়ে পরতে বলেছেন। অত্যাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। জাগ্রত হতে বলেছেন কৃষক, মজুরদের যারা আজ অবহেলিত, শোষিত! তাদের হাতে যেন অত্যাচারী বিশ্ব উপড়ে পরে! উৎপীড়কদের প্রসাদ যেন ভেঙে দেয়। কবি এই প্রবন্ধে অত্যাচারীত, দিন খাটা অবহেলিত মানুষদের ডাক দিয়ে গেছেন। যারা নিজের চক্ষের সম্মূখে অন্যায় দেখেও চুপ তাদের জেগে উঠতে বলেছেন।

সাম্যবাদী

সাম্যবাদী

সাম্যবাদী

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৫ সালের শেষের দিকে প্রথম প্রকাশিত হয়। সাম্যের জয়গান নিয়ে মোট ১১ টি কবিতার সংকলন এই কাব্য গ্রন্থটি। ব্রিটিশ ভারতে লেখা বইটিতে ধর্ম, জাত, লিঙ্গ সবকিছু পিছনে ফেলে মানুষের পরিচয়ই যে মহান তাই ফুটিয়ে তুলেছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের এই গ্রন্থের ১১ টি কবিতা গুলো যথা: ‘সাম্যবাদী’, ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘মিথ্যাবাদী’, ‘নারী’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘সাম্য’, ‘কুলিমজুর’। এই কবিতাগুলো তিনি যথারীতি সাম্যের কথা বলে গেছেন। নিচে কাব্যগ্রন্থটি থেকে “সাম্যবাদী” কবিতার শেষ দুই লাইন উল্লেখ করা হলো:

“মিথ্যা শুনিনি ভাই—
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
-কাজী নজরুল ইসলাম

অগ্নিবীণা

অগ্নিবীণা

অগ্নিবীণা

কাজী নজরুল ইসলামের লেখা প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। পুরো কাব্যগ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা বারোটি। বাংলা ভাষায় সর্বাধিক পাঠিত কবিতা “বিদ্রোহী” এই কাব্য গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত! এছাড়া ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’, ‘আগমণী’, ‘ধূমকেতু’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার রণভেরী’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’ ও ‘মোহররম’ কবিতা গুলো আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এই গ্রন্থটি শুধুমাত্র কয়েকটি কাবিতার সংকলনে একটি গ্রন্থ নয়! গ্রন্থের কবিতা গুলো একটি জাতির আবেগ, ইতিহাস, স্বকীয়তা, এমনকি একটি শতাব্দির গতিময়তার নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত।

অগ্নিবীণা গ্রন্থটি কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক কাব্যিক উচ্চারণ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে স্থান দখল করেছে। পরাধীন জাতির হীনমন্যতা, মানসিক দাসত্ব উৎপাটনে সমকালের এক সঞ্জীবনী টনিক এই অগ্নিবীনা। নিচে এই কাব্য গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত বিদ্রোহী কবিতার কয়েক লাইন তুলে ধরা হলো:

বিদ্রোহী

“বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!”
-কাজী নজরুল ইসলাম।

লেখক: ইমন বর্মণ

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *