টপ ৫: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা ৫ বই

রবীন্দ্র ভুবনে ডুব দেওয়ার পর ভালো না লাগার মতো সাহিত্য খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। পৃথিবীর সৌন্দর্যের মাঝে প্রকৃতির বন্ধনা, অস্থির মনকে নীল মেঘের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে মনে মনে তেপান্তরের রূপকথায় রবীন্দ্র সাহিত্য হারিয়ে দেয়! বাস্তবিকতা, রোমান্টিকতা, প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম, সেকুলারিজম আপনাকে এক ভিন্ন মানুষে বদলে দিবে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি কর্মকে সেরা ৫ এ নিয়ে আশা সত্যিই কঠিন কাজ। সহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তিনি অতূল্য সাফল্য নিয়ে যে রচনা গুলো করে গেছেন এই প্রবন্ধে সেরা ৫ টি সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা করব।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা ৫ বই

রক্তকবরী

রক্তকবরী

রক্তকবরী

অসীম মোহ কিভাবে মানুষের জীবনের সব সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করে মানুষকে নিছক যন্ত্র ও উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণে পরিণত করেছে এবং এর ফলে তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কীরূপ ধারণ করেছে এরই প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকবরী নাটকটিতে। ১৩৩০ বাংলা সনে শিলং এ নাটকটি ‘যক্ষপুরী’ নামে প্রকাশিত হলেও ১৩৩১ সনে প্রবাসে ‘রক্তকবরী’ নামে প্রকাশিত হয়। সাংকেতিক নাটকটিতে দেখা যায়, যক্ষীপুরের শোষক রাজা অর্থলোভে অন্ধ। তার মোহের আগুনে পুরে মরে স্বর্ণের খনির কুলিরা। তার কাছে মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মূল্য নেই, একেক জন শ্রমিক যন্ত্রের একেক অংশ মাত্র। রাজার কাছে মনুষ্যত্ব, মানবতা এ যন্ত্রবন্ধনে পীড়িত ও অবমানিত। রাজা প্রেম ও সৌন্দর্য, নন্দিনীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয় লোভের মোহে, সন্ন্যাসী পান নি তার ধর্মসংস্কারের মোহে, মজুররা পায়নি অত্যাচার ও অবিচারের লোহার শিকলে বাঁধা পড়ে, পন্ডিত পায়নি দাসত্বের মোহে। এক সময় রাজা নন্দিনীকে পেতে চাইলেন, যেভাবে সে সোনা আহরন করেন। কিন্তু প্রেম ও সৌন্দর্যকে এভাবে লাভ করা যায় না। তাই রাজা নন্দিনীকে পেয়েও পাননি। নন্দিনী রঞ্জন কে ভালোবাসলেও রঞ্জন যন্ত্রের বন্ধনে বাঁধা। এ যন্ত্র নন্দিনীকে প্রেম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জড় যান্ত্রিকতা ও জীবনধর্মের মধ্যে একটা সামঞ্জস্যের সন্ধান কবি এই নাটকটিতে তুলে ধরেন। যা আমাদোর সমাজের অন্ধ মস্তিষ্কোর মানুষের দিকে প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত করে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: দ্য দা ভিঞ্চি কোড এর মতো আরো ৫ টি বই

গল্পগুচ্ছ

গল্পগুচ্ছ

গল্পগুচ্ছ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্পের সংকলন হচ্ছে গল্পগুচ্ছ। এতে মোট ৯১ টি গল্প রয়েছে। ১৯০৮-১৯০৯ সালের মাঝে এই সংকলন পাঁচ খন্ডে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্যের ছোট গল্প গুলোর মধ্যে এই সংকলনটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন। ঘাটের কথা, দেনা-পাওনা, কাবুলিওয়ালা, হৈমন্তী, অপরিচিতা ইত্যাদির মতো বিখ্যাত ও হৃদয়স্পর্শ করার মতো ছোট গল্প দ্বারা বইটি সাজানো হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নিপুন ভাষায় বাস্তবিকতাকে প্রতিটি গল্পে তুলে ধরেছে। তৎকালীন সমাজের নারীর প্রতি বৈষম্য, যৌতুক সমস্যা থেকে শুরু করে আবার কোনো গল্পে ফুটে উঠেছে এক যাযাবর কাবুলিওয়ালার কথা!কোনো কোনো গল্পে সমাজ সংস্কারের প্রতি দিয়েছে বিশেষ জোড়! হৈমন্তী গল্পে রবীন্দ্রনাথ আঘাত করেছেন হিন্দু বিবাহ সংস্কার ও ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভন্ডামিকে। তুলে ধরেছেন বিবাহিত বাঙালি রমণীর জীবন্মৃত অবস্থাটি। দেখিয়েছেন কেমন করে হৈমন্তী নামে এক সংবেদনশীল যুবতীকে তার স্বাধীনতাস্পৃহার জন্য শেষ পর্যন্ত প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। ‘মুসলমানীর গল্প’ ছোট গল্পে তুলে ধরেছেন হিন্দু-মুসলমানের বিরুধের মূল কারণ গুলো। যা আমাদের বাস্তব সমাজের সাথে গল্পের চরিত্র গুলো মিল বের করে দেয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসর, সাজাদপুর ও শিলাইদহ সহ পারিবারিক জমিদারির বিভিন্ন অংশে ঘুরে সাধারণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদের জীবন থেকেই এই সব গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেন। তৎকালীন ভারতের দরিদ্র জনগণের জীবনের প্রতি এক গভীর অন্তদৃষ্টি এই সব গল্পে নিহিত হয়ে আছে। আর তাই গল্পগুলি ভারতীয় সাহিত্যে একক স্থানের অধিকারী। গল্পগুচ্ছের প্রতিটি গল্পই আপনার সমাজকে চোখের পলকে আরেকবার দৃশ্যমান করে দেখিয়ে দেয়।

গোরা

গোরা

গোরা

১৯ শতকে ভারত বর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সময় লেখা রবি ঠাকুরের গোরা উপন্যাস রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনের বিতর্ক প্রকাশ পায়। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র পরেশবাবু। উপন্যাসে পরেশ বাবু তথাকথিত ধর্ম, সমাজ সবকিছুর উপরে যিনি মানুষের মঙ্গলকে বড় করে দেখেছেন। তার সব কিছুকে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখা, নিজের অন্তঃকরনে শুভ চিন্তায় মগ্ন থাকা, সমাজের মতো অন্ধভাবে না মেনে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করা, সেই মতো সিদ্ধান্ত নেয়া এইসব কিছু মুগ্ধ করে। অন্যদিকে আনন্দময়ী আরেক মুগ্ধ হওয়ার মতো চরিত্র। তিনি বিনয় ও গোরার মা। বিজাতি গোরাকে বুকে তুলে নিয়ে যিনি জাত খুইয়েছেন। অনেক দ্বীধা দ্বন্ধের মাঝে বড় হওয়া তার ছেলে বিনয় এক সময় নিজ আত্মাকে বুঝতে পারেন। বিজাতি ললিতা কে ভালোবেসে নিজ আত্মাকে উপলব্ধি করতে শিখে। তার ভাষায়, “মানুষের সমস্ত প্রকৃতিকে এক মুহূর্তে জাগ্রত করিবার উপায় এই প্রেম”। ললিতা আর তার মাঝখানে বাধা হয়ে দাড়ান অনাহূত সমাজ, ধর্মাচার কে সে মানেনা, হৃদয় দিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। বিভিন্ন সময় বিনয় কিংবা গোরার মুখ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মূলত খুব উঁচু মানের সূক্ষ ভাষায় মানুষের, সমাজের কথাই বলে গেছেন। জন্মসূত্রে নিজেকে ভারতবর্ষের পবিত্রজাতি হিন্দু মনে করা গোরা যখন নিজের আসল পরিচয় জানতে পারে তখন তার সমস্ত ভুল ভাঙে। ভুল ভেঙে সে সত্যকে চেনে। সত্য কি? জন্মপরিচয়? নাকি বহুসংশয়ে গড়ে তোলা নিজের বিশ্বাসবোধ? ধর্ম, সমাজ, সম্প্রদায় এসব পাশে ঠেলে রবীন্দ্রনাথ গোরার মধ্য দিয়ে বলে গেলেন সত্যর কথা। সত্য হল মানুষ, মানবসত্য! গোরা তার খোঁজ পায় তার দেশের মাঝে।দেশের সমস্ত মানুষের মাঝে। উপন্যাসের নাম ও মানুষের নামেই। এই গল্প তাই দেশের, দেশের মানুষের।প্রচণ্ড চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়েও শেষ পর্যন্ত গোরা হার মানে। আইরিশ রক্ত শিরায় নিয়ে জন্মানো গৌরমোহন।

জন্মপরিচয় মানুষের আসল পরিচয় ঠিক করে দেয় না,মানুষ মানুষই থাকে। অপেক্ষা থাকে শুধু মানুষের উপলব্ধির। রবীন্দ্রনাথের গোরা আমাদের এটাই শিক্ষা দিয়ে যায়। বিশ্বকবির মানব ধর্মের চেতনার বহি প্রকাশ এই গোরা উপন্যাস। নিজের চিন্তা ও মনন বিকাশের জন্য অবশ্যই এর পাঠ সবার আবশ্যক।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: নাজিম উদ্দিন এর সেরা ৫টি থ্রিলার বই

গীতবিতান

গীতবিতান

গীতবিতান

রবি ঠাকুরের সকল গানের সংকলন নিয়ে গীতবিতান রচিত। গীতবিতানের প্রথম সংস্করন ১৯৩১ সালে দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এক সংস্করণের সকল গান ‘পূজা’, ‘স্বদেশ’, ‘প্রেম’, ‘প্রকৃতি’, ‘বিচিত্র’ ও ‘আনুষ্ঠানিক’ পর্যায়ে কবি গুরু বিন্যস্ত করেন। কবির মৃত্যুর পর এর দ্বিতীয় সংস্করন আবার দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। বর্তমান সময় অবধি এই সংস্করন প্রচলিত। ১৯৫০ সালে কবির যাবতীয় গীতিনাট্য-নৃত্যনাট্য ও অন্যান্য গ্রন্থের অসংকলিত গান নিয়ে গীতবিতান সংষ্করনের তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। বাঙালি জাতির কাছে এই রবীন্দ্র সংগীতের সংকলনটি আজও বেশ জনপ্রিয়। রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া রবীন্দ্র সাহিত্যকে কল্পনা করা যায় না। রবীন্দ্র প্রেমিদের সবার উচিত গীতবিতানের সংকলন সংরক্ষনে রাখা। নিচে গীতবিতান থেকে বহুল প্রচলিত একটি ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের গানের কয়েক লাইন উল্লেখ্য করা হলো:

ও আমার দেশের মাটি,
তোমার পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর,
তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।
তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে,
তোমার ওই শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা।।
(সংক্ষিপ্ত)

গীতাঞ্জলি

বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
নাই বা দিলে সান্ত্বনা
দুঃখ যেন করিতে পারি জয়।

গীতাঞ্জলি

গীতাঞ্জলি

এমনি ১৫৭ টি ব্রহ্ম-ভাবাপন্ন গীতকবিতার সংকলন হচ্ছে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি। ১৯০৭-১৯০৮ সালের মধ্য সময়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এই সংকলনের কবিতা গুলো প্রকাশিত হওয়ার পর অর্থ্যাৎ ১৯১০ সালে গীতাঞ্জলি প্রথম কাব্য গ্রন্থ রূপে প্রকাশিত হয়। এই কাব্য গ্রন্থের বেশির ভাগ গীতকবিতা শিলাইদহ, কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে বসে লেখা হয়। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে এই কাব্য গ্রন্থটি ইংরেজি অনুবাদ “Song Offerings” প্রকাশিত হয়। মূল কাব্য গ্রন্থের অন্তভূক্ত ৫৩ টি গান ইংরেজি গ্রন্থে প্রকাশ করা হয়। যা বাংলার গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব সাহিত্যে হৃদয় কেরে নিয়েছিল। এই অনুবাদের জন্য ১৯১৩ সালে এশিয়দের মধ্যে কবি গুরুকে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

রবীন্দ্র সাহিত্যের এক বড় অংশ গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থ। এই ভক্তি মূলক গানের সংকলনটি আপনার হৃদয়কে শীথিল করে দিবে। বইটি না পরে থাকলে অবশ্যই পড়ে নিবেন।

লেখক: ইমন বর্মণ

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *