টপ ৫: কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেরা ৫ টি বই

অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যকে পূর্ণতা দিয়েছেন ভিন্ন সব আঙ্গিকে। তার উপন্যাস, ছোট গল্প অতুল্য! দেবদাস থেকে শ্রীকান্ত এই অনন্য সৃষ্টি গুলো কোটি বাঙালির হৃদয়ে আজও বেঁচে রয়েছে। তার সাহিত্য কর্ম সামাজিক চিত্রের কথা বলে, মানুষের ভিতরের আত্মিক সম্পর্কের প্রসারন করে, কখনো ভঙ্গুর রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তুলে। এই পর্বে এই অপরাজেয় কথা সাহিত্যিকের সেরা পাঁচটি বই নিয়ে আলোচনা করা হলো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেরা ৫ টি বই

পরিণীতা

পরিণীতা প্রচ্ছদ

পরিণীতা প্রচ্ছদ

পরিণীতা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাস। কলকাতার প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাসটি ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র ললিতা ও শেখর। দুইজন প্রতিবেশী হলেও শেখর ললিতাকে পড়াশুনায় উৎসাহীত করে এবং মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান দান করে। ললিতা অনাথিনী আর শেখর জমিদারে একমাত্র পুত্র! ললিতার চাচা গুরুচরণ দরিদ্র ব্রাহ্মণ। তিনি তার মেয়ের বিয়ের জন্য শেখরের বাবার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল, যা তাদের মধ্যে বিবাদের কারণ হয়ে দাড়ায়।

“পরিণীতা” গল্পে আসলে শরৎচন্দ্র মিথ্যা নৈতিক আদর্শের রীতি-নীতি এবং গ্রাম্য জীবনের সংকীর্ণ রাজনীতিকে প্রকটভাবে দেখিয়েছেন। যা কিনা সমগ্র পল্লীবাংলার গ্রাম্য মহিলাদের ক্ষয়ের কারন। যুবতী পরিণীতার বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি এবং পরোপকারের ইচ্ছা এখানে সযত্নে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সমাজের কদর্য নিয়ম-নীতির থেকে বেরিয়ে এসে সমগ্র গ্রাম্য মহিলাদের পুনরুজ্জাগরণের কাহিনী হল এই “পরিণীতা”।

পথের দাবী

পথের দাবী প্রচ্ছদ

পথের দাবী প্রচ্ছদ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম একটি জনপ্রিয় উপন্যাস পথের দাবী। বিংশ শতাব্দীর এই উপন্যাসটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লেখা হয়! ১৯২৬ সালে উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার এটি নিষিদ্ধ করে। উপন্যাস অনুসারে পথের দাবী মূলত শোষক গোষ্ঠী বিরুধী একটি সংগঠন! যার উদ্দেশ্য কারখানার গরীব শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের দ্বারা বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। এতে রক্তের গঙ্গা বয়ে গেলেও তাদের কিছুই করার সময় নেই। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সব্যসাচী ওরফে ডাক্তার সাহেব গড়ে তুলেন এই সংগঠন। তবে তার মতের ব্যপারে ভিন্ন মত উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভারতীর। তার মতে রক্তারক্তি নয়, সে চায় শুধুই কারখানার শ্রমিক দের জীবন মান উন্নয়ন, কৃষকের শিক্ষা ইত্যাদি। মূলত ভারতী এবং ডাক্তারের কথোপকথনের মাধ্যমে লেখক শরৎচন্দ্র দুইটি ভিন্ন দর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছেন সুনিপুণভাবে।অন্যদিকে ক্রীশ্চান ভারতী ভালোবাসে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অপূর্ব বাবুকে। যার কাছে বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ হয়ে টিকে থাকাটাই সার্থকতা। যার ভিতরে দেশপ্রেম আছে, তেজ নেই। ভারতীর প্রতি যে ভালোবাসা আছে সেটা বোঝার বোধশক্তি নেই। তারপরেও এই অপূর্ব বাবুকে ভালোবাসে ভারতী। ঐদিকে ডাক্তার সব্যসাচী নেমে পড়েন স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

বিশ শতকের সমাজব্যবস্থাকে শরৎচন্দ্র তুলে ধরেছেন এই বইটিতে। যেখানে সমাজ বৃটিশ শৃঙ্খলের উৎপীড়ন মুক্ত হয়ে নতুন সমাজ গড়ে তুলতে চায়। প্রবল দাঙ্গাপূর্ণ বিশ শতকের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিই এই কাহিনীর মূল।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সেরা ৫ বই

রামের সুমতি

রামের সুমতি প্রচ্ছদ

রামের সুমতি প্রচ্ছদ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রামের সুমতি প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। লেখক তার গল্পের দ্বারা মানুষের আত্মিক সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেছেন। গল্পের প্রধান চরিত্র এক দুরন্ত কিশোর রামলাল। তার দুষ্টবুদ্ধির কারনে শুধু নিজের গ্রামের নয়; আসে পাশের গ্রামেরও কিছু মানুষ ভীত! তার দুরন্তপনার একান্ত সহযোগী ভৃত্য ভোলা। অপরদিকে তার বড় ভাই শ্যামলাল শান্ত প্রকৃতির। তার কাজ পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশুনা করা। তার স্ত্রী নারায়ণী! যে বছর শ্যাম বিয়ে করে সেই বছর রামের মা আড়াই বছরের রামকে তার হাতে দিয়ে মারা যান। সেই থেকে রামের বৌদির কাছে কোলে পিঠে মানুষ হওয়া! রাম কারো কথা মান্য না করলেও বৌদির কথা মান্য করে। বৌদির জ্বর ভালো না হলে ডাক্তারকে শাসিয়ে আসে। এক সময় নারয়ণীর মা দিগম্বরী ও তার ছোট বোন সুরধনীর আগমনে তাদের সুখের সংসারে বিঘ্ন ঘটে! শ্যামের শ্বাশুড়ি সব সময় রামের পিছনে লেগে থাকে। একদিন রাম পেয়ারা গাছে উঠে পেয়ারা খাওয়ার সময় দিগম্বরী তাকে কটাক্ষ করলে রাম তাকে উদ্দেশ্য করে পেয়ারা ছুড়ে মারে যা নারায়ণীর মাথায় লাগে। এই ঘটনার পর শ্যাম দুই ভাইয়ের সম্পত্তি ভাগ করে ও নারায়ণীকে রামের সাথে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়। আপনজন শূন্যতায় রাম তার ভুলগুলো বুঝতে পারে ও তার সুমতি হয়।

বৌদি ও দেবরের সুন্দর সম্পর্ককে লেখক অসামান্য দক্ষতায় এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন। মধ্যবিত্ত সমাজের পারিবারিক সম্পর্কের অনুভূতিগুলো সত্যিই খুব মর্মস্পর্শী।

শ্রীকান্ত

শ্রীকান্ত প্রচ্ছদ

শ্রীকান্ত প্রচ্ছদ

চার খন্ডে লেখা শ্রীকান্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি জীবনচরিত মূলক বই। ভ্রমন কাহিনী লক্ষ্যণীয় এই উপন্যাসটির প্রথম পর্ব ১৯১৭ সালে এবং শেষ পর্ব ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। শ্রীকান্ত উপন্যাস রূপে প্রকাশিত হওয়ার আগে ভরতবর্ষ মাসিক পত্রিকায় ভ্রমন কাহিনী রূপে প্রাকাশিত হয়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শ্রীকান্ত যিনি জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ননার ছলে উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন বিচিত্র সব ঘটনার বর্ণনা ও অসংখ্য নরনারীর সমাবেশ। সেসব ঘটনা ও বহুল চরিত্রের মধ্যেও উপন্যাসের মূলসূত্র শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মীর প্রণয় কাহিনী শেষ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। শ্রীকান্ত রাজলক্ষ্মীর পাশাপাশি শ্রীকান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথম পর্বের ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদি, দ্বিতীয় পর্বের অভয়া, তৃতীয় পর্বের ব্রজানন্দ ও সুনন্দা এবং চতুর্থ পর্বের গহর ও কমললতার হার্দিক ও সামাজিক সম্পর্কের বহু বর্ণিত বিষয় উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে; সাথে তৎকালীন বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থারও একটি বাস্তব চিত্র এতে তুলে ধরা হয়েছে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা ৫ বই

দেবদাস

দেবদাস প্রচ্ছদ

দেবদাস প্রচ্ছদ

১৯০১ সালে লেখা দেবদাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস। ১৯১৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হলে বইটি সর্ব মহলে খ্যতি অর্জন করতে থাকে। পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বইটি অনূদিত হয়। উপন্যাসের মূল চরিত্র জমিদার বাড়ির ছেলে দেবদাস ও সাধারণ বাড়ির মেয়ে পার্বতী! তাদের শৈশব থেকে একি গ্রামে বড় হওয়া। স্কুল থেকে মাছ ধরা; সবখানেই পার্বতী দেবদাসের সাথে থাকত। পারু কিছু ভুল করলে দেবদাস আবার তাকে মারত। তারপরও তারা দুইজন খুব ভালো বন্ধু! একসময় বাড়ি থেকে দেবদাসকে জোর করে কলকাতায় লেখাপড়া জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে পারু বড় হতে থাকে; আর ঐ দূরে দেবদাস। অনেক বছর পর লেখাপড়া শেষে দেবদাস বাড়ি চলে আসে। এসেই তার সেই বন্ধু পারু কে দেখতে যায়। পারু যে দেবদাসকে ভালোবাসে সে কথা আর মনে চাপা থাকে না! তারপর সেই বন্ধুত্ব রূপ নেয় ভালোবাসার বন্ধনে। একসময় পারুর বাড়ি থেকে দেবদাসের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু দেবদাসের বাবা সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। ঐদিকে পারুর বিয়ে ঠিক হয়ে যায় অন্য ছেলের সাথে। তখন দেবদাস আবার শহরে ফিরে আসে। পারুর বিয়ে হয়! কলকাতায় দেবদাস যন্ত্রনায় আত্মহারা হয়ে যায়; মদ পান করতে থাকে! চন্দ্রমুখী নামের এক নাচওয়ালীর সাথে দেখা হয় দেবদাসের। চন্দ্রমুখী দেবদাসকে ভালোবেসে ফেলে। এদিকে দেবদাস অতিরিক্ত মদ্য পানে অসুস্থ হয়ে পরে। একসময় দেবদাস পারু কে কথা দিয়েছিল বলে সে পারুর বাড়িতে আসে। মদ্য পান করা দেবদাস অন্তিম মুহূর্তে এসে পৌঁছলে লুটিয়ে পরে মারা যান!

“দেবদাস” সম্পূর্ণরূপে একটি প্রেম কাহিনী। যদিও এই গ্রন্থটি সেভাবে কোন বার্তা প্রেরণ করে না,তবুও তৎকালীন ধনবৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, অযৌক্তিক দম্ভের লড়াই, সদ্যযৌবনের প্রেমাবেগ কিভাবে সমাধিস্থ হল রূঢ় সমাজ ও মানবিক নিয়ম-নীতির কাছে তাই এই উপন্যাসের কাহিনী।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেরা ৫ বই

আরো আছে!

বিরাজবৌ

বিরাজবৌ প্রচ্ছদ

বিরাজবৌ প্রচ্ছদ

১৯১৪ সালে বিরাজবৌ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বিরাজবৌ উপন্যাসটি তৎকালীন সমাজ নিয়ে লেখা একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। উপন্যাসে নীলাম্বর ও পীতাম্বর দুই ভাই ও হরিমতি তাদের একমাত্র বোন। দাদা পীতাম্বর বুদ্ধিহীন হলেও পরোপকারী। উপার্জন করেন না তবে প্রচুর গাঁজা খান। ভাই পীতাম্বর সংসারী; তিনি নিজের উপার্জন নষ্ট না করে পৈত্রিক সম্পত্তি দুই ভাগ করে দিয়ে বাড়ির মাঝে পাঁচিল তুলে দিলেন। নীলাম্বরের স্ত্রী বিরাজমোহিনী এতে কষ্টে পড়লেন এরমাঝে হরিমতির দেখাশোনার ভার নীলাম্বরকেই নিতে হল। হরিমতির বিয়ে দিতে এবং তার স্বামীর পড়াশোনার খরচ দিতে নীলাম্বরকে বিষয়সম্পত্তি-জমিজমা সব বন্ধক রাখতে হল। কিন্তু বিরাজের পরামর্শ সত্ত্বেও মমতাবশত পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে পারলেন না। অন্যদিকে বিরাজ নিজে অভুক্ত থেকেও স্বামীর অন্ন জোগাতে লাগল। বিরাজ দেখতে ছিল রূপবতী। যার ফলে গ্রামের নতুন জমিদার রাজেন্দ্রকুমার সুন্দরী বিরাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। রাজেন্দ্র বিরাজকে দেখার জন্য মাছ ধরার বাহানায় পুকুরে ছিপ ফেলে বসে থাকতেন। বিরাজ একদিন স্নান করতে গিয়ে ঘাটে রাজেন্দ্রকুমারকে দেখে খুব অপমান করলেন। ঐদিন রাতে চাল ধার করতে বেরিয়ে গাঁজাখোর নীলাম্বর সন্দেহভাজন পানের ডিবেয় ছুড়ে মারে। আহত হলেন বিরাজ।এরপর অপমানিতা হয়ে গৃহত্যাগ করে বিরাজ উঠলেন জমিদারের বজরায়। কিন্তু বজরায় বিপদ বুঝে নদীতে ঝাঁপ দিলেন তিনি। কে বা কারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে দিল। তারপর বিরাজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে দাসীবৃত্তি-ভিক্ষাবৃত্তি করে শেষে তারকেশ্বরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তীর্থযাত্রী নীলাম্বরের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। কিন্তু তখন তার অবস্থা প্রায় শেষ! অবশেষে অনুতপ্ত স্বামীর কোলে মাথা রেখে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিরাজ!

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *