কিভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লো শ্রীলঙ্কা?

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় এখন শুধুই হাহাকার। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনোই এতোটা দুরাবস্থায় পড়েনি দেশটি। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সঙ্কট এবং বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত দেশটি। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় ঠেকেছে যে তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয়ও মেটাতে পারছে না। আর তাই জিনিসপত্রের দাম এখন আকাশছোঁয়া, বিরাজ করছে চরম মুদ্রাস্ফীতি। আবার বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে কাগজ আমদানি করতে না পাড়ায়, কাগজের অভাবে দেশটির স্কুল পর্যায়ের পরীক্ষাও বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। আছে তীব্র লোডশেডিং এবং জ্বালানী তেলের তীব্র সঙ্কট। কারণ, জ্বালানী তেল আমদানি করার জন্য বৈদেশিক মুদ্রাও নেই শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু, একসময় সকল সামাজিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা এবং শিক্ষায় সবার তুলনায় এগিয়ে থাকা সম্ভাবনাময় এই দেশটির কেন এই দুর্দশা? কীভাবে তারা এই গভীর সংকটে পড়ল? চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে এই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকটে পড়লো একসময়কার সম্ভাবনাময় এই দেশটি।

কিভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লো শ্রীলঙ্কা?

কিভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লো শ্রীলঙ্কা?
কিভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লো শ্রীলঙ্কা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীলঙ্কার এই মরণদশার মূলে আছে সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। সরকারের একের পর এক অবিবেচক সিদ্ধান্ত এবং কিছুটা দুর্ভাগ্যই দেশটিতে এই গভীর সংকট তৈরি করেছে। আর যার শুরু ২০০৫ সালে, যখন রাজস্ব আসে না এমন বড় বড় প্রকল্পে শ্রীলঙ্কা বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার কাছ থেকে বাণিজ্যিক ঋণ নেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থ খরচ করলেও অনেক প্রকল্পই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়নি। যার মধ্যে রয়েছে হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর, কলম্বো পোর্ট সিটিসহ বিভিন্ন রাস্তা এবং আরো নানা ধরণের প্রকল্প।

হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর
হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর

গত এক দশকে শুধুমাত্র চীনের কাছ থেকেই শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর বাইরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুদ্রা বাজার, জাপান এবং ভারতের কাছ থেকেও বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এছাড়া অর্থ কিভাবে পরিশোধ করা হবে সে ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা না করেই সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে শ্রীলঙ্কা। অর্থনীতিবিদরা বলেন, একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে এ ধরণের সার্বভৈৗম বন্ড বিক্রি করা হয়। আর শ্রীলঙ্কা সেটাই করেছে। এরমধ্যে ঋণের পরিমাণ বিশাল হলেও চলতি বছরই শ্রীলঙ্কাকে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, চলতি বছর এসব ঋণ শোধ করতে পারবে না দেশটি।

শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট দেশটিতে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমান
শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট দেশটিতে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমান

ঋণ পরিশোধের বেহাল দশা হয়েছে আরো একটি কারনে, যখন, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশটিতে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত নেন, আর তাও করোনা মহামারি শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে। এই অতিমাত্রায় কর কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যায়। আর সেই ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার আরো ঋণ বেশি নেয় এবং শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত মুদ্রা (শ্রীলঙ্কান রুপি) ছাপতে শুরু করে। ফলে অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি অনেক বেড়ে যায়। শ্রীলঙ্কায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ছিল যেখানে ৪.৩ শতাংশ, সেখানে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই হার পৌঁছেছে ১৭. ৫ শতাংশে।

এমনিতে দেশটির অন্যতম প্রধান আয়ের ক্ষেত্র পর্যটন খাত, কিন্তু ২০১৯ সালের এক সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই খাতটি। তারপরে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আসে, কোভিড-১৯ মহামারি। মহামারির কারনে ব্যাপক ধস নামে শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতে। আর করোনার ফলে দেশে দেশে জারি করা হয় “লকডাউন”। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রীলঙ্কার আরেকটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস – বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স। লকডাউনে অনেক শ্রীলঙ্কান শ্রমিক তাদের চাকরি হারায়, আর এরফলে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসা প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। সুতরাং, কোভিড-১৯ মহামারী এবং সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার খাতসমূহ উল্লেখযোগ্যভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

একদিকে যখন বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমেছে, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করতে থাকে। ফলস্বরূপ, ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলারে এসে নেমেছে। আর এই অবস্থা খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে শ্রীলঙ্কার নির্ভরতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের ফলে কাগজও আমদানি করতে পারছে না দেশটি। ফলে পরীক্ষায় বসতে পারছে না দেশটির স্কুলপড়ুয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থী। কাগজের সংকট এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় পত্রিকা প্রকাশও করতে পারেনি শ্রীলঙ্কার প্রথম সারির বেশ কয়েকটি পত্রিকা।

রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় কৃষকদের বিক্ষোভ
রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় কৃষকদের বিক্ষোভ

বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের ফলে খাদ্য আমদানি করতে না পারার পাশাপাশি দেশের ভিতরে খাদ্য উৎপাদনও কমেছে ব্যাপক ভাবে। আর যার জন্য দ্বায়ী ২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক দেশে সম্পূর্ণ অর্গানিক কৃষি চালু করার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের পরে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষিক্ষেত্রে এবং সর্বোপরি অর্থনীতিতে। এতে চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। অন্যান্য ফসলের উৎপাদনশীলতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। যে চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, সেখানেও লাগে বড় ধাক্কা। উৎপাদন কম হওয়ায় ক্ষতির মুখে পরে কৃষকরা। ফলস্বরূপ, এটি কৃষকদের বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। আর দেশজুড়ে একই সাথে খাদ্যঘাটতিও প্রকট আকার ধারণ করে, ফলে চাল, শাকসবজি, ফল-মূল এবং চায়ের মতো খাবারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। পরে যদিও রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু তত দিনে কৃষিকার্যে বিপুল ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।

আর এভাবেই বছরের পর বছর ধরে একের পর এক অবিবেচক সিদ্ধান্ত এবং কোভিড-১৯ দুর্ভাগ্যই দেশটিতে এই তীব্র অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।

বর্তমান সংকট সামাল দিতে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা। সেজন্য অনেকের দ্বারস্থ হচ্ছে দেশটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর সাথে আলোচনা করছে তারা। এছাড়া চীন ও ভারতের কাছে আরো ঋণের আবেদন করেছে শ্রীলঙ্কা। তবে যেভাবে শ্রীলঙ্কা ঋণের স্তুপ তৈরি করেছে, সেখান থেকে খুব সহজে দেশটি বেরিয়ে আসতে পারবে না বলে মনে করছেন দেশটির পর্যবেক্ষকরা।



error: