ক্যাটারেক্ট বা চোখের ছানি: রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

আমরা এমন একটা যুগে বাস করি যেখানে আমাদের দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা থাকাটা খুব জরুরী। যেকোন পেশায় হোক কিংবা একটা ছোট বাচ্চা সবার-ই দেখার সমান অধিকার আছে। মাঝে মাঝে এই দৃষ্টি কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে নানান কারণে। এমনকি অন্ধত্ব পর্যন্ত বরণ করে নেয়া লাগতে পারে। বর্তমানে পৃথিবীতে রিভার্সিবল ব্লাইন্ডনেসের অন্যতম কারণ হচ্ছে ছানি পড়া বা ক্যাটারেক্ট (Cataract)। অনেকেই কম বেশি এর সম্পর্কে শুনেছেন। আজকে আমরা আর-ও কিছু জেনে নেই এই রোগ সম্পর্কে।

ক্যাটারেক্ট (Cataract) বা চোখের ছানি কি?

চোখের ছানি: রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
চোখের ছানি: রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

আমাদের চোখের ভিতরে কর্নিয়ার ঠিক পিছনে একটা ট্রান্সপারেন্ট বা স্বচ্ছ লেন্স আছে। ক্যামেরার যেমন লেন্স থাকে ঠিক তেমনি আমাদের চোখে ভিতরেও লেন্স থাকে। এই লেন্সটি জন্ম থেকে একদম স্বচ্ছ থাকে। যাতে সহজে আলো চোখে ভিতরে প্রবেশ করে আমাদের চোখের রেটিনার উপরে ছবি তৈরি করতে পারে। এই লেন্সটি যখন বয়স বা কোন অসুখ বা কোন আঘাতের কারণে যখন ঘোলা হয়ে যায় ফলে আলো ঠিক মত বা কোনভাবেই যখন চোখের ভিতর ঢুকতে পারে না তখন আমরা একে ছানি পড়া বা ক্যাটারেক্ট বলে থাকি।

কি কারণে চোখে ছানি পড়ে?

১। জন্মগত ভাবে: একটা ভ্রূণ যখন মায়ের পেটে বড় হতে থাকে তখন মায়ের বিভিন্ন অসুখ এর কারণে জন্মগত ভাবে কিংবা জন্মের পরে বাচ্চার চোখে ছানি পরতে পারে। সিফিলিস, রুবেলা, টক্সোপ্লাজমা, এইচাইভি, ভেরিসেলা এসব রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের শিশুর জন্মগত ছানির সমস্যা হয়ে থাকে।

২। বার্ধক্যজনিত ছানি: বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের স্বচ্ছ লেন্স ধীরে ধীরে ঘোলা হতে থাকে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর এই ঘোলা লেন্স দিয়ে আমরা কাছের আর দূরের কাজ করতে পারবো না সহজে। ৬০-৬৫ বছর থেকে কিংবা কখনো আগেই এই বার্ধক্যজনিত ছানি পরতএ পারে।

৩। আঘাতজনিত কারণে ছানি: চোখে আঘাত লাগলে সেটা থেকে চোখের স্বচ্ছ লেন্স ধীরে ধীরে কিংবা হুট করেই ঘোলা হয়ে যেতে পারে।

৪। কমপ্লিকেটেড ছানি: চোখের অনেকদিন ধরে থাকা বিভিন্ন অসুখ যেমন ইউভিয়াইটিস এর কারণে চোখে যে কোন বয়সে ছানি পরতে পারে।

৫। অন্য অসুখের ক্ষেত্রে: যাদের ডায়াবেটিস, এল্কাপ্টনিউরিয়া এসব রোগ থাকে তাদের অল্প সময়ের মধ্যে ছানি পরতে পারে।

চোখে ছানি পরার লক্ষণসমূহ

  • দূরের জিনিস ধীরে ধীরে ঝাপসা দেখতে পাওয়া যা চশমা দিয়েও কারেকশন করা যায় না এবং চোখের অন্যান্য অংশ সুস্থ থাকা সত্ত্বেও।
  • অনেকেই কাছের জিনিস বা পড়ালেখাতে সমস্যা বোধ করেন। চশমা পরা সত্ত্বেও।
  • দূরের যেকোন জিনিস ভাঙ্গা ভাঙ্গা দেখা বা একটা জিনিস এর কয়েকটা ছায়া দেখা। যেমনঃ আকাশে ভাঙ্গা চাঁদ বা চাঁদের অনেকগুলা প্রতিবিম্ব দেখা।
  • দূরের মানুষের চেহারা অস্পষ্ট দেখতে পাওয়া।

ছানির চিকিৎসা

  • কোন ঔষধ দিয়ে কখনো ছানি কাটে না বা সারে না।
  • ছানির একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন করা ও একটা কৃত্রিম লেন্স চোখের ভিতরে লাগানো।
  • বাচ্চাদের ছানির ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে নতুবা বাচ্চা ঠিক মত দেখা শিখবে না।
  • ছানির অপারেশনের পর প্রয়োজনমত কাছে পড়ার জন্য চশমা কিংবা উন্নত লেন্স এর ক্ষেত্রে কোন চশমা ছাড়াই পরিষ্কার দেখা যায়।

ছানির অপারেশন “ফ্যাকো” সার্জারী

(Cataract Phaco Surgery)

ছানির অপারেশন “ফ্যাকো (Phaco)” সার্জারী
ছানির অপারেশন “ফ্যাকো (Phaco)” সার্জারী

ছানির চিকিৎসায় ফ্যাকা তথা ফ্যাকোইমালসিফিকেশোন সার্জারি হচ্ছে সর্বাধুনিক। এতে কম্পিউটারের সাহায্যে চোখের মধ্যে খুব ছোট একটা ছিদ্র করে তার মধ্যে দিয়ে ঘোলা হয়ে যাওয়া লেন্সটা বের করে এনে একটা স্বচ্ছ কৃত্রিম লেন্স লাগিয়ে দেয়া হয়। এই লেন্স মৃত্যু পর্যন্ত চোখের ভিতরে থাকে। এই লেন্স অনেক প্রকারের হয়ে থাকে সে অনুযায়ী ছানির অপারেশনের দামের তারতম্য ঘটে থাকে।

ছানি পরা কোন ভয়াবহ অসুখ নয়। প্রকৃতির খেয়ালে সবার চোখেই আস্তে আস্তে ছানি পরতে পারে। কারো আগে বা কারো পরে। চোখের ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে চোখের ছানির অপারেশন করায়ে নিলে আবার পূর্বের ন্যায় দৃষ্টি ফিরে পাওয়া সম্ভব।

ডাঃ ফাহিম হায়দার খান
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল)
মেডিক্যাল অফিসার, বাংলাদেশ আই হসপিটাল



error: