করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে জানা অজানা সকল তথ্য

কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই, করোনাভাইরাস একাধিকবার নিজেকে পরিবর্তিত করেছে। যার মধ্যে কিছু কিছু প্রজাতি অন্যদের চেয়ে বেশি সংক্রামক এবং মারাত্মক। বর্তমানে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই করোনাভাইরাসের ৪টি ভ্যারিয়েন্টকে চিন্তার কারন হিসেবে উল্লেখ করেছে: আলফা, বিটা, গামা এবং ডেল্টা। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টই সবেচেয়ে বেশি আক্রান্ত করছে। এই ৪টি ছাড়াও পরবর্তী মারাত্মক ভ্যারিয়েন্টগুলোর জন্য ইটা, আইওটা, কাপ্পা এবং ল্যাম্বডা নামে ৪টি নামও মনোনীত করেছে তারা। যারমধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট এর দ্রুত বিস্তার বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শুধু দ্রুত বিস্তার লাভের ক্ষমতার জন্যই নয়, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হারও এই ভ্যারিয়েন্টেই দেখা গেছে। এটি বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করছে। এছাড়াও আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং যুক্তরাজ্য সহ কমপক্ষে ২৮ টি দেশে এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে।

করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট কী?

করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট কী?
করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট কী?

যে কোনো ভাইরাসই ক্রমাগত মিউটেশনের মাধ্যমে নিজেকে বদলাতে থাকে, এবং এর ফলে একই ভাইরাসের নানা ধরন তৈরি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাইরাসের এই পরিবর্তন আমাদের মাথাব্যথার কারন হয়ে দাড়ায় না। কারণ নতুন সৃষ্ট বেশিরভাগ ভ্যারিয়েন্ট মূল ভাইরাসের চেয়ে দুর্বল এবং কম ক্ষতিকর হয়।

কিন্তু কিছু ভ্যারিয়েন্ট আবার অধিকতর ছোঁয়াচে এবং মারাত্মক হয়ে ওঠে। অনেক সময় টিকা দিয়েও একে কাবু করা দুরূহ হয়ে পড়ে। করোনাভাইরাসের এমনই একটি ভ্যারিয়েন্টের নাম ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট। যা পূর্বের সকল ভ্যারিয়েন্টের থেকে বেশি মারাত্মক। করোনার এই ভ্যারিয়েন্টের বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে C.37। পূর্বে এটি পরিচিত ছিল আন্দিয়ান স্ট্রেইন নামে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২১ সালের ১৪ জুন, এই ভ্যারিয়েন্টের নাম রাখে ল্যাম্বডা।

কোথায় এবং কখন এটি প্রথম সনাক্ত হয়?

করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট প্রথম সনাক্ত হয় পেরুতে
করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট প্রথম সনাক্ত হয় পেরুতে

করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট প্রথম সনাক্ত হয় দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে, ২০২০ সালের আগস্ট মাসে। যদিও এই ভ্যারিয়েন্টের মূল উৎপত্তিস্থল এখনো অস্পষ্ট, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি প্রথম দক্ষিণ আমেরিকাতেই আবির্ভূত হয়েছিল। পেরুর জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট অনুসারে, গত তিন মাসে (২০২১ সালের মে, জুন, জুলাই) পেরুতে সনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিল এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টের।

কতটা ছড়িয়েছে করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট?

গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা (GISAID) এর তথ্য অনুসারে, ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট ইতিমধ্যেই কমপক্ষে ২৮ টি দেশে ছড়িয়েছে। এসব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পেরু, ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, এবং জিম্বাবুয়েসহ আরও কিছু দেশ। জিআইএসএআইডি হল সংক্রামক রোগের তথ্য সংগ্রহ এবং আদান-প্রদানে নিয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।

নতুন ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট কতটা সংক্রামক বা বিপজ্জনক?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো করোনার অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের সাথে তুলনা করে ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টটি সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করছে। যার মধ্যে রয়েছে এটি কতটা সংক্রমণশীল, কতটা মারাত্মক এবং প্রচলিত ভ্যাক্সিনগুলো এর বিরুদ্ধে কার্যকর কিনা। ২০২১ সালে জুনের মাঝামাঝি সময়ে, ডব্লিউএইচও বলে “করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট সন্দেহজনক ফেনোটাইপিক প্রভাবসহ বেশ কয়েকটি মিউটেশন বহন করে, যেমন সম্ভাব্য বর্ধিত সংক্রমণ বা অ্যান্টিবডি নিরপেক্ষ করার সম্ভাব্য বর্ধিত ক্ষমতা।”

ভ্যারিয়েন্টটির স্পাইক প্রোটিনের নির্দিষ্ট অস্বাভাবিক মিউটেশনগুলো উল্লেখ করে ডব্লিউএইচও বলেছে, “করোনার এই জিনোমিক পরিবর্তনের পরিপূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে বর্তমানে সীমিত প্রমাণ রয়েছে” এবং ” পাল্টা ব্যবস্থাগুলো উপর এর প্রভাব ভালোভাবে বুঝতে এবং এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে আরও অধ্যয়নের প্রয়োজন।” সুতরাং করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট অধিকতর সংক্রামক কিংবা বিপজ্জনক কিনা তা জানতে আসলে আরো অধিক গবেষণা প্রয়োজন।

টিকা কাজ করবে এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে?

টিকা কাজ করবে এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে?
টিকা কাজ করবে এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে?

দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলে চাইনিজ করোনাভ্যাক বা সিনোভ্যাক ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে। আর তাই বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ গবেষণা হয়েছে মূলত চীনের এই ভ্যাক্সিন করোনার এই ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট এর উপর কতটা কার্যকর তা নিয়েই। আর খুশির কথা হল গবেষকরা আশার বানীই শুনিয়েছেন। তারা বলেছেন করোনাভাইরাস তার মূল আকার থেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছে। আর তাই যেকোনো ভ্যাক্সিনই আসল করোনাভাইরাসের উপর যতটা কার্যকর ছিল, তা ভ্যারিয়েন্টে কিছুটা কার্যকারিতা হারাতে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভ্যাকসিন আর কাজ করছে না। আর তারা এটাও বিশ্বাস করে, চাইনিজ করোনাভ্যাক এখনও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ভালভাবেই কার্যকর। তবে কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট ভ্যাক্সিনে তৈরি এন্টিবডিগুলো নিরপেক্ষ করে দিতে সক্ষম। তবে এখনই চিন্তিত হয়ে পড়বেন না।

আসলে করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টের উপর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে বলার আগে আরো অনেক গবেষণা করতে হবে। বিশেষত পশ্চিমের দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় এমন ভ্যাকসিনগুলোর এই ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর তা জানতে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন, যেমন ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না বা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা-র উপর।

বিজ্ঞানীরা, অবশ্য বসে নেই, তারা দিনরাত পরিশ্রম করছে করোনার ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্টসহ সকল ভ্যারিয়েন্টেগুলো সম্পর্কে জানতে, ভ্যাকসিনগুলো তাদের উপর কতটা কার্যকর তা খুঁজতে। আর এর মাঝে যতদিন পর্যন্ত করোনা মহামারীর শেষ হয়, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সকল ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, ভ্যাকসিন বা টিকা দিতে হবে, এমনকি টিকা দেওয়ার পরেও আমাদের সকল ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মোটকথা সরকার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্দেশিত সকল পরামর্শ মেনে চলতে হবে।



error: