স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম মন্দির: বিশ্বের সর্ববৃহৎ হিন্দু মন্দির

ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা হিন্দু মন্দিরগুলো অন্যতম। আর কেনই বা হবে না? হিন্দু মন্দিরের দেশ ভারত। একেকটি মন্দির সুপ্রাচীন এবং তা বহন করে ভারতীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যেকলার ইতিহাস। আর এমনই পরিপূর্ণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ধাঁচে তৈরি অপূর্ব হিন্দু মন্দির হল অক্ষরধাম মন্দির। মন্দিরটি স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম মন্দির নামেও পরিচিত। তবে মন্দিরটি কেবল ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মারকই নয়, একবিংশ শতকের অন্যতম বিস্ময়ও।

স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম মন্দির

অক্ষরধাম মন্দিরের অবস্থান এবং শুরুর কথা

ভগবান স্বামীনারায়ণ
ভগবান স্বামীনারায়ণ

সম্পূর্ণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ধাঁচে তৈরি অপূর্ব সুন্দর অক্ষরধাম মন্দিরটি অবস্থিত ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। দিল্লিতে অবস্থানের কারনে এই মন্দিরকে স্থানীয়রা দিল্লি অক্ষরধাম মন্দির নামেও বলে থাকেন। ভগবান স্বামীনারায়ণের প্রতি শ্রদ্ধায় তার চতুর্থ আধ্যাত্মিক শিষ্য যোগীজি মহারাজ যমুনা নদীর তীরে একটি বড় মন্দির করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছেপূরণে বোচাসন্ন্যাসী শ্রী অক্ষর পুরুষোত্তম (বিএপিএস) স্বামীনারায়ণ সংস্থার গুরু প্রমুখ স্বামী মহারাজের অনুপ্রেরণায় এই মন্দির গড়ে তুলেছে বিএপিএস সংস্থা। ভগবান স্বামীনারায়ণের জীবন ও শিক্ষাদান হিন্দুধর্মের কেন্দ্রীয় প্রথাগুলো, অহিংসা এবং ব্রহ্মচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল।

‘অক্ষর’ মানে হল ঈশ্বর এবং ‘ধাম’ মানে হল বাস। অর্থাৎ ‘অক্ষরধাম’ অর্থ ‘ঈশ্বরের ঐশ্বরিক নিবাস’। যা একদিক দিয়ে যথার্থই। কেননা ভক্তদের কাছে স্বামীনারায়ণ হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার। আর এই মন্দিরে স্বামীনারায়ণের পুজো করা হয়। এছাড়া ভগবান রাম-সীতা, রাধা-কৃষ্ণ, শিব-পার্বতী এবং লক্ষ্মী-নারায়ণ এর পূজাঅর্চনাও করা হয় এখানে।

১৯৮২ সালে, প্রমুখ স্বামী মহারাজ তার গুরুর স্বপ্ন পূরণ করতে ভক্তদের দিল্লিতে মন্দির নির্মাণের সম্ভাবনার দিকে তাকাতে প্ররোচিত করেন। উদ্যোগ নেওয়ার পরে কেবল ভূমি অধিগ্রহণেই বেশকিছু বছর লেগে যায়। এরপর ২০০০ সালের ৮ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাত্র ৫ বছর পরেই কাজ শেষ হয়ে যায় এই মন্দিরের। অবশেষে ২০০৫ সালের ৬ নভেম্বর অক্ষরধাম মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হয় এবং দর্শক, ভক্ত ও পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হয় মন্দিরের দরজা।

স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম মন্দিরের নির্মাণশৈলী

অক্ষরধাম মন্দিরের নির্মাণশৈলী
অক্ষরধাম মন্দিরের নির্মাণশৈলী

মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে বাস্তুশাস্ত্র ও পঞ্চতন্ত্র শাস্ত্রের সকল রীতিনীতি মেনে। তাই এই মন্দিরের গায়ে অ্যাংকর ভাট, যোধপুর, পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দির, কোনারক, ওডিশার ভুবনেশ্বর মন্দির সহ দক্ষিণ ভারতের বহু মন্দির গাত্রের কারুকাজ দেখা যায়। বহতা যমুনার পাড়ে ৮৬ হাজার ৩৪২ বর্গফুট জায়গার ওপর অবস্থিত এই স্থাপনাটি। মন্দিরের মূল অংশটি প্রায় ১৪১ ফুট উচু (৪৩ মিটার), ৩১৬ ফুট চওড়া (৯৬ মিটার), এবং ৩৫৬ ফুট লম্বা (১০৯ মিটার)। মন্দিরের মধ্যে রয়েছে অলংকৃতভাবে খোদাই করা ২৩৪ টি পিলার, ৯টি বিশাল গম্বুজ ও ২০,০০০ মূর্তি ও হিন্দু দেব-দেবী, সাধু-আচার্যদের স্থাপত্য। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ভগবান স্বামীনারায়ণের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের অঙ্কিত-অলঙ্কৃত চিত্র।

স্বামীনারায়ণ অক্ষরধামের গজেন্দ্র পীঠ
স্বামীনারায়ণ অক্ষরধামের গজেন্দ্র পীঠ

গোটা মন্দিরটি রাজস্তানের গোলাপী বেলেপাথর ও ইটালিয়ান কারারা মার্বেল দিয়ে তৈরি হয়েছে। এর জন্য প্রায় ছয় হাজার টন গোলাপি পাথর আনা হয়েছিল রাজস্থান থেকে। উল্লেখ্য, মন্দির তৈরিতে কোন স্টিল বা কংক্রিট ব্যবহার হয়নি। হিন্দু সংস্কৃতি ও ভারতের ইতিহাসে হাতির গুরুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক মন্দিরের বহু অংশে হাতির স্থাপত্য বানানো হয়েছে, যার নাম “গজেন্দ্র পীঠ”। এতে মোট ১৪৮ টি সত্যিকার হাতির প্রায় সমান আয়তনের হাতি রয়েছে, যাদের মোট ওজন প্রায় ৩,০০০ টন।

অক্ষরধাম মন্দিরের গর্ভগৃহে উপবিষ্ট মুর্তি ও বেদী

অক্ষরধাম মন্দিরের গর্ভগৃহে অভয়মুদ্রায় সিংহাসনে উপবিষ্ট স্বামীনারায়ণ মুর্তি
অক্ষরধাম মন্দিরের গর্ভগৃহে অভয়মুদ্রায় সিংহাসনে উপবিষ্ট স্বামীনারায়ণ মুর্তি

মন্দিরের দেবালয় বা গর্ভগৃহে (প্রধান গম্বুজের নীচে) রয়েছে ১১ ফুট (৩.৪ মিটার) উঁচু স্বামীনারায়ণ মুর্তি। যেখানে স্বামীনারায়ণ অভয়মুদ্রায় সিংহাসনে উপবিষ্ট আছেন। আর স্বামীনারায়ণকে ঘিরে রয়েছেন তার স্বর্গীয় শিষ্য গুনাতিনন্দ স্বামী, ভগতজি মহারাজ, শাস্ত্রীজি মহারাজ, যোগীজি মহারাজ এবং প্রমুখ স্বামী মহারাজ। তারা স্বামীনারায়ণ এর প্রতি ভক্তিমূলক অথবা সেবার ভঙ্গিতে রয়েছেন। প্রতিটি মূর্তি হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী পঞ্চধাতু বা পাঁচটি ধাতু দিয়ে তৈরি। মন্দিরে ভগবান রাম-সীতা, রাধা-কৃষ্ণ, শিব-পার্বতী এবং লক্ষ্মী-নারায়ণের মুর্তিও রয়েছে।

পুরো মন্দিরজুড়ে বিভিন্ন অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সনাতন ধর্ম ও ভারতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষসহ সৃষ্টির জীবন-সংগ্রামের বিভিন্ন গল্প। প্রধান মন্দিরের বাইরেও স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম কমপ্লেক্সে রয়েছে অভিষেক মণ্ডপ, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ পূজা দিতে পারেন। আছে প্রদর্শনী হল, ওয়াটার শো, থিম্যাটিক গার্ডেনও। খাবার-দাবারের জন্য ফুড কোর্ট এবং কেনাকাটার জন্য আছে শপিং সেন্টারও।

অক্ষরধাম মন্দিরের প্রবেশ দ্বারসমূহ

অক্ষরধামে প্রবেশপথ ‘ভক্তি দ্বার’
অক্ষরধামে প্রবেশপথ ‘ভক্তি দ্বার’

অক্ষরধামে প্রবেশ করতে হয় ‘দশ দ্বার’ বা দশ দরজা দিয়ে। এই দ্বারের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি ও মত-বর্ণের বৈচিত্র্য বোঝানো হয়েছে। দশ দ্বার পেরিয়ে ‘ভক্তি দ্বার’। অলঙ্কৃত পাথরে নির্মিত এই ভক্তি দ্বারে রয়েছে ভক্ত-ভগবানের নানা শৈল্পিক রূপ। এরপর আছে ‘ময়ুর দ্বার’। এই দ্বারে বিভিন্ন আকার ও নকশার ৮৬৯টি পাথুরে ময়ুরের স্থাপত্য সৌন্দর্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির আত্ম-শুদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে। আর একেবারে ভেতরে রয়েছে দেবালয় বা গর্ভগৃহ।

মন্দিরের এই বিশালতার কারণেই অক্ষরধাম মন্দির বিশ্বের সর্ববৃহৎ হিন্দু মন্দির হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে জায়গা করে নিয়েছে। ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অফিশিয়াল বিচারক মাইকেল উইটি আমেদাবাদে এসে প্রমুখ স্বামী মহারাজের হাতে সনদপত্র তুলে দিয়ে যান। তবে আকারের চাইতেও অক্ষরধাম মন্দির হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি এবং ভারতবর্ষের নানা ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সমন্বয়ে নির্মিত এক অপূর্ব নান্দনিক স্থাপত্য।



error: