কুম্ভমেলা: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় জমায়েত

ভারত মানেই প্রাচীন সংস্কৃতি। আজ আমরা আলোচনা করব কুম্ভ মেলার সম্পর্কে। কুম্ভমেলা বা कुम्भ मेला একটি হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এই মেলা  উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা তীর্থস্নান করতে আসেন এবং এখানে তারা এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালন করেন। বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হিসাবে ২০১৩ সালে এখানে ১০ কোটিরও বেশি মানুষের আগমন ঘটে। আমরা জানি যে ধর্ম মানুষ কে শান্তির পথে নিয়ে যায়, আর এর আরেকটি উদাহরণ হল এই কুম্ভমেলা, যেখানে মেলায় আগত ভক্ত এবং দর্শনার্থীদের পুলিশ সাপোর্ট লাগেনা।

হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্যবাহী উৎসব, কুম্ভমেলা

এটা একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং প্রতি ছয় বছর অন্তর হরিদ্বার ও এলাহাবাদে অর্ধকুম্ভ মেলা বসে। প্রতি বারো বছর বা এক যুগ অন্তর অন্তর প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জ্বয়িনী ও নাসিকে পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয়ে থাকে। হিসাব করলে দেখা যায় প্রতি তিন বছর পরপর চার জায়গার কোথাও না কোথাও কুম্ভমেলা বসবেই যদিও তা পূর্ণই হোক বা অর্ধ। বারোটি পূর্ণকুম্ভ বা পরিপূর্ণ কুম্ভ মেলা, অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ। এই মহা কুম্ভ বিশেষ মর্যাদার সাথে পালিত হয়। কুম্ভমেলা চারটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আয়োজিত হয়ে থাকে। এই চারটি স্থান নির্বাচিত হয় বৃহস্পতি গ্রহ ও সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী। যখন বৃহস্পতি ও সূর্য সিংহ রাশিতে অবস্থান করে নাসিকের ত্র্যম্বকেশ্বরে এ অনুষ্ঠিত হবে। সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করলে কুম্ব মেলা হবে হরিদ্বারে। বৃহস্পতি বৃষ রাশিতে ও সূর্য কুম্ভ রাশিতে অবস্থান করলে কুম্ভ হবে প্রয়াগে আবার সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করলে উজ্জয়িনীতে মেলা আয়োজিত হয়। বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে।

কুম্ভমেলা ২০১৩

কুম্ভমেলা ২০১৩

এই কুম্ভমেলাটি নদী কেন্দ্রিক আয়োজিত হয়ে থাকে। প্রতি মেলার সঙ্গে এক বা একাধিক নদী জড়িয়ে আছে যা আমরা উল্লেখ করেছি। আসলে এসব নদী কেন্দ্রীক মেলা সমূহ অনুষ্ঠিত হয় কারণ এতে যোগাযোগ করা খুব সহজ হয়ে থাকে। বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুণ্যস্নানই হল কুম্ভমেলার প্রধান অংশ। যেমন ইলাহাবাদের মেলাটি হয় গঙ্গা – যমুনা ও অন্তসলিলা সরস্বতীর সংযোগ স্থানে। আর হরিদ্বারে প্রবাহিত হচ্ছে গঙ্গা। শুধু তাই না, আরো আছে উজ্জয়িনীতে শিপ্রা এবং নাসিকে গোদাবরী। এই গোদাবরী নদীর তীরে নাসিকে পুণ্যস্নান হয় দুই জায়গায়। বৈষ্ণবরা গোসল করেন নাসিকের রামকুণ্ডতে আর অন্য দিকে শৈবরা গোসল বা স্নান করেন নাসিক থেকে ৩০ কিমি  দূরে ত্র্যম্বকেশ্বর নামক এক যায়গায়। ১৮৩৮ সালের দিকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক মনোমালিন্য হয় আর এর ফলে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।

কুম্ভমেলা

কুম্ভমেলা

এই কুম্ভমেলার ইতিহাস জানতে হলে আমাদের হিন্দু পুরাণের দ্বারস্থ হতে হবে, যেমন হিন্দু পুরাণে উল্লেখ করা আছে, “সমুদ্র মন্থন করে বা বিনাশ  করে অমৃত কুম্ভের হাঁড়ি নিয়ে দেবতারা যখন সেই হাঁড়ি নিয়ে পালাচ্ছিলেন, তখন হাঁড়ি থেকে কয়েক ফোঁটা অমৃত পরে যায়“। যে চার স্থানে সেদিন ঐ অমৃত পরেছিল তা আজকের  কুম্ভমেলার স্থান। যদিও এখানে নিরাপত্তার কোন সমস্যা নেই। তবুও ভারত সরকার বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখেন। অসলে ভারত বর্ষে হাজার হাজার বছরের ধর্মীয় সংস্কৃতি নির্বিঘ্নে পালিত হয়ে আসছে। এই সব নিরাপত্তা বাদেও এই কুম্ভ মেলা চলবে ঠিক যে ভাবে চলেছে। ২০০৭ সালের দিকে বছরের প্রথম দুই মাসের ৪৫ দিন ধরে অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয়েছিলো। আর এখানে সেই সময় সাত কোটিরও বেশি হিন্দু তীর্থযাত্রী যোগ দেন। ২০০১ সালে সর্বশেষ মহাকুম্ভে (মহা কুম্ভের ব্যপারে উপরে বলা আছে) যোগ দিয়েছিলেন ছয় কোটি হিন্দু ধর্মভীরু মানুষ, এদের মধ্যে ছিলো সাধারণ হিন্দু থেকে শুরু করে সন্ন্যাসী। এটি ছিল ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাবেশ (Kumbh Mela ‘Britannica.com.)।

কুম্ভমেলায় আগত ভক্ত এবং দর্শনার্থী

কুম্ভমেলায় আগত ভক্ত এবং দর্শনার্থী

প্রতি বারো বছর পর পর অনুষ্ঠেয় এই মেলা হয়ে থাকে তাকে অন্যতম বৃহৎ মেলা বলা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় জমায়েত। কারণ এত বড় ধর্মীয় সমাবেশ আসলেই বিড়ল। পাপমোচনের আশায় আজ কয়েক কোটি হিন্দু পুণ্যার্থী গঙ্গা ও যমুনা নদীর মোহনায় মহাস্নানে অংশ নিয়ে থাকেন। মেলার অনেক স্থানের মধ্যে সবগুলোতেই যথাযথ স্নানের ব্যবস্থা থাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন যে গঙ্গায় এই স্নানের মধ্য পাপ এবং জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

লেখক: রকিব হাসান

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap