মীনাক্ষী মন্দির: বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মন্দির

মীনাক্ষী মন্দির, ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ মন্দির। ভারত মানেই স্থাপত্যকলার এক নৈসর্গিক ভূমি, আর সেই অপার সৌন্দর্য কে আরো সৌন্দর্যময় করতেই যেন এই রহস্যঘন, সুনিপুণ এবং শৈল্পিক মন্দিরের সৃষ্টি।

দৃষ্টিনন্দন মীনাক্ষী মন্দির

দৃষ্টিনন্দন মীনাক্ষী মন্দির

দৃষ্টিনন্দন মীনাক্ষী মন্দির

মীনাক্ষী মন্দিরের গায়ে আমরা যে চিত্রাকর্ষক কলাশিল্প দেখা পায় তাতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সূত্রপাত দেখা যায়।ভারত উপমহাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন দেবী জাঙ্গুলির মূর্তিও এই মন্দিরের শরীরে বসানো আছে, যা গোটা ভারতে দেখা না। শুধু মাত্র এখানেই  দেখা যায়। ভাস্কর্যগুলো সবই প্রায় এনামেল রঙ দ্বারা আবৃত। তবে হলুদ বা পোড়া ইটের কালার অনেক বেশী। এ ছাড়াও মন্দিরের সামনের অংশটির মেঝে পুরো মারবেল পাথর দিয়ে তৈরি। যা সেই সময়ের তুলনায় অনেক উন্নত স্থাপত্যকর্ম। নায়াকদের আমলে মন্দির প্রাঙ্গণে বিশাল সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপিত হতো এবং এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধু-সন্তের পাশাপাশি অনেক রাজন্যবর্গও আসতেন। যেন এটাই ছিলো তখন কার সময়ের মিলন কেন্দ্র। আজ যেমন আমরা টাউন হলের কথা বলি। সেই সময় এইসব মন্দির ব্যবহৃত হত মিলন মেলায়। এটা প্রতীয়মান যে  মন্দিরটি প্রায় সবগুলো চূড়াই মূলত পিরামিড আকৃতির (অনেকটাই মিশরীয় পিরামিড আকৃতিগত, হয়ত কোন মিল আছে)।

স্থাপত্যের এই অভিনবত্ব  দেখে অনেকই মনে করেন, মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল মিশরের পিরামিডকে লক্ষ্য রেখে। কেননা সেই সময় মিশরীয়দের এবং এই অঞ্চলের মাঝে ব্যবসা হত। আমরা জানি যে প্রাচীন মিশরের মমির কাপড় যেতে আমাদের নরসিংদীর ওয়ারি বটেশ্বর এলাকা থেকে (জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, আর্কেওলজি বিভাগ)। মিসরের পিরামিডে যেমন দেবতাদের চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন অশুভ শক্তির দৃশ্যত হত, ঠিক তেমনি মীনাক্ষী মন্দিরেও রয়েছে অনেক শুভ এবং অশুভ শক্তির দৃশ্যপট। শুভ বলতে যা দেবতার মূর্তি বা ভাল প্রতীক আর অশুভ বলতে অপদেবতা বা খারাপ প্রতীক।

দৃষ্টিনন্দন মীনাক্ষী মন্দিরের ভিতরের দিক

দৃষ্টিনন্দন মীনাক্ষী মন্দিরের ভিতরের দিক

ভারতীয় উপকথায় কথিত আছে যে দক্ষিণ ভারতের রাজা মলয়দাজা এবং তার রানী কাঞ্চনমালি অনেকদিন ধরে ঈশ্বরের কাছে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করছিলেন। তাদের এই কায়মনোবাক্যে  প্রার্থনা দেখে খুশী হন। তাদের আকুল প্রার্থনায় ঈশ্বর সন্তুষ্ট হলে যজ্ঞের আগুন থেকে এক পরম সুন্দরী কন্যাশিশুর জন্ম হয়। তো সেই মেয়ের নাম রাখা হয় মীনাক্ষী। আর এই মীনাক্ষী নাম থেকেই বর্তমানের মীনাক্ষী মন্দির। বলা হয়ে থাকে, যখন মীনাক্ষীর  বয়স হয়, তখন মীনাক্ষী দেবতা শিবকে বিয়ে করেন এবং সংসার করতে থাকে। সুখে শান্তিতে তারা মাদুরাই শহরেই শাসন করতে থাকেন। যেহেতু এই রাজকুমারী মীনাক্ষীর নামানুসারেই পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ভারতের ঐতিহাসিক মীনাক্ষী মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। আজো ভারতের অনেক মেয়ের নাম মীনাক্ষী রাখা হয়।

বিভিন্ন কথা এই মন্দিরটি সম্পর্কে শোনা যায়। যেমন ঐতিহাসিকদের কিছু বক্তব্য আছে। জানা যায়, ১৪ সালের কাছাকাছি সময়ের দিকে মল্লিকপুরের মুসলিম হানাদার মালিক কাফুর এই মন্দিরটি লুট করে এর মূল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় (যদিও এসব নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান তবুও হয়ত কিছুটা এমন ইতিহাস ছিল)। আবার ১৬ সালের দিকে শাসক বিশ্বনাথ নায়াকের তত্ত্বাবধানে এই মন্দিরটি আবার পুনঃসংস্কার করে উপাসনালয়ে পরিণত করা হয়। আজ আমরা এই মন্দিরটির যে অবকাঠামো এবং চেহারা দেখতে পাচ্ছি তা বিশ্বনাথ নায়াকের কল্যাণে, সেই সময় তিনি যে কাঠামোতে তৈরি করেছিলেন সেই কাঠামোই এটা।

আরো পড়ুন:  কুম্ভমেলা: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় জমায়েত

মীনাক্ষী মন্দিরটি ভারতের স্থাপত্যকলা নিদর্শনের ইতিহাসে এক মাইলফলক। কেননা এটা সেই সময়ের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে। ভারতের ইতিহাসের রাজবংশীয় শাসনকালের ইতিহাসের মধ্যে ঐতিহাসিক এই মাদুরাই নগর সম্পর্কে কিছু জানতে গেলে মীনাক্ষী মন্দিরটি চলে আসে। এই মীনাক্ষী মন্দিরটি যেন নিজেই ইতিহাস এর লিপি। যার পড়তে পড়তে ইতিহাস লিখা। সাড়ে চার হাজার পিলার এবং ১২টি টাওয়ার মিলিয়ে পুরো মন্দিরটি মোট ১৫ একর বা ৪৫ বিঘা জমির ওপর এই বিশালাকার মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত।

আরো অনেক কাহিনী আছে এই মন্দিরের পিছে। যেমন আরেক পুরাণ অনুযায়ী ধারণা করা হয় যে দেবরাজ ইন্দ্রর শিবলিঙ্গ প্রাপ্তির পর পরই এই মন্দিরটি এখানে স্থাপন করা হয়।

এই মন্দিরে অনেক টাওয়ার আছে। টাওয়ারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারটির উচ্চতা হল প্রায় ১৭০ ফুট এবং মাদুরাই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মন্দিরের চূড়া দেখা যায়, যেন শহরের পরিচয় বাহক। আজ যেমন কুতুব মিনার, শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখা যায়। মন্দির কর্তৃপক্ষের এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার পর্যটক ও পূজারি এখানে  আসে, হ্যা! ঠিক শুনেছেন। ১৫০০০ হাজার পর্যটক ও পূজারি এখানে  আসে এই মন্দিরটি দেখতে এবং শিবের আশীর্বাদ নিতে।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *